পরিচ্ছন্ন নগরীর পথে রংপুর! চ্যালেঞ্জ কতটা?
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগে পরিচ্ছন্ন নগরীর প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে হকারদের জীবিকা, ক্রেতাদের প্রয়োজন এবং নগরীর শৃঙ্খলা – এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরকে ঘিরে নতুন সাজে সেজেছিল নগরী। সড়ক ও ফুটপাত পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগে বদলে যায় নগরীর চেনা দৃশ্যপট। দীর্ঘদিন ধরে হকারদের দখলে থাকা ফুটপাতগুলো করা হয় দখলমুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার পরও সেই পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখার উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে তৈরি করেছে নতুন প্রত্যাশা। প্রশ্ন উঠেছে-রংপুর কি সত্যিই হকারমুক্ত, পরিচ্ছন্ন নগরীর পথে এগোচ্ছে, নাকি এই পরিবর্তন কেবল বিশেষ উপলক্ষকেন্দ্রিক?
প্রধানমন্ত্রীর সফরের চার দিন পরও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার তৎপরতা দৃশ্যমান। রংপুর সিটি করপোরেশন, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে দোকান না বসানোর বিষয়ে মাইকিং করে সচেতন করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। নগরীর পরিচ্ছন্নতা ও পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফুটপাত পথচারীদের জন্য, সেখানে দোকান বসলে বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও প্রতিবন্ধীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নামতে হয় পথচারীদের। এতে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, তৈরি হয় যানজট।
তবে নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখার এই উদ্যোগের আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। ফুটপাতের ছোট দোকানগুলো অনেক মানুষের জীবিকার অবলম্বন। পুঁজি কম, স্থায়ী দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করেই পরিবার চালান। অন্যদিকে, নগরীর নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের একটি অংশও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য এসব দোকানের ওপর নির্ভর করেন। তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের ব্যবসায়ীদের তালিকা করে তাঁদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি এও বলেছেন পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে তিনি বদ্ধপরিকর।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিচ্ছন্নতা ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ।
প্রথমত, নগরীতে প্রকৃত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। কারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন, কারা সম্পূর্ণভাবে এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং কারা অন্য কোথাও ব্যবসা পরিচালনার সামর্থ্য রাখেন না,তা যাচাই করা জরুরি। এই তালিকার ভিত্তিতে তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবসাস্থল নির্ধারণ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নগরীর উপযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট হকার জোন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার বাজার গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে স্বল্প ভাড়ায় দোকান বসানোর সুযোগ, নির্ধারিত ব্যবসার সময় এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নিয়ম থাকবে। জায়গার সংকট থাকলে মানুষের চলাচল ও যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। তবে বিকল্প স্থান এমন হতে হবে, যেখানে ক্রেতাদের যাতায়াত রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা বাস্তবে বিক্রির সুযোগ পান।
তৃতীয়ত, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, স্থায়ী দোকানমালিক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ফুটপাত দখল করে রাখলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ক্ষুদ্র হকারদের উচ্ছেদ করে অন্যদের দখল বজায় থাকলে নগরবাসীর কাছে উদ্যোগটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
চতুর্থত, নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ কোনো সফর, উৎসব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনকে কেন্দ্র করে ফুটপাত পরিষ্কার করা এবং পরে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, এমন চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে স্থায়ী তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকলে ফুটপাত পুনর্দখলের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হকারদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পথচারীদের অধিকার এবং নগরীর শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। কারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কোনো সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও নিরাপদ চলাচলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রংপুরের সামনে এখন সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে তৈরি হওয়া পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগকে স্থায়ী নগর ব্যবস্থাপনায় রূপ দেওয়া। এর জন্য শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। যদিও সিটি প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডনের নগর পরিচ্ছন্নতার এই কার্যক্রম টেকসই করতে নেয়া নানা পরিকল্পনা দীর্ঘ সময়ের অব্যবস্থাপনা ভেঙে নতুন রংপুরে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
লেখক
নাজমুল ইসলাম নিশাত
রংপুর ব্যুরো প্রধান, সময় টিভি।


আপনার মতামত লিখুন