ময়ের সাথে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে কেনাকাটার ধরনও। কয়েক বছর আগেও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মানুষকে বাজারে যেতে হতো, দোকান ঘুরে পছন্দের পণ্য খুঁজতে হতো। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই পাল্টে গেছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কেনাকাটাকে নিয়ে এসেছে একেবারে হাতের মুঠোয়। কয়েকটি ক্লিকেই অর্ডার করা যাচ্ছে পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্য কিংবা ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। সময় বাঁচানো, ঝামেলা কম হওয়া এবং ঘরে বসেই পণ্য পাওয়ার সুবিধা এসব কারণে অনলাইন কেনাকাটা মানুষের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পেজ, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম কিংবা লাইভ সেল এসবের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করছেন। অনেক ছোট উদ্যোক্তাও এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের জন্যও বাজার হয়ে উঠেছে আরও সহজলভ্য।
কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে আরেকটি অন্ধকার বাস্তবতা অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যামিং। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে ব্যবহার করছে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে।
অনেক সময় দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সেখানে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পণ্য খুব কম দামে বিক্রির প্রলোভন দেখানো হয়। ছবিগুলো এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয় যে সাধারণ ক্রেতারা সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন। অনেকেই ভাবেন, হয়তো বিশেষ কোনো অফার চলছে বা স্টক ক্লিয়ারেন্সের কারণে দাম কম। কিন্তু বাস্তবে সেই পণ্য হয় নিম্নমানের হয়, নয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু পাঠানো হয় অথবা ডেলিভারি চার্চ পূর্বে নেওয়ার নাম করে টাকা নিয়েই ব্লক করে দেওয়া হয়।
কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণা আরও পরিকল্পিতভাবে করা হয়। ভুয়া অনলাইন পেজ বা ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, গ্রাহকদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলা হয়, এমনকি কিছু ভুয়া রিভিউও দেখানো হয় যাতে পেজটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে অর্ডার নেওয়ার পর যখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা জমা হয়, তখন হঠাৎ করেই সেই পেজ বা ওয়েবসাইট উধাও হয়ে যায়। গ্রাহকেরা তখন বুঝতে পারেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন, কিন্তু অনেক সময় তখন আর কিছু করার থাকে না।
আরেক ধরনের প্রতারণা হলো অগ্রিম পেমেন্টের ফাঁদ। অনেক অনলাইন বিক্রেতা অর্ডার নিশ্চিত করার জন্য আগে থেকেই পুরো টাকা বা আংশিক টাকা বিকাশ, নগদ বা অনলাইন ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাতে বলেন। অনেক ক্রেতা বিশ্বাস করে সেই টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু পরে দেখা যায় পণ্য আর আসে না, কিংবা যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রতারণাগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ধীরে ধীরে পুরো অনলাইন বাজার ব্যবস্থার উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন মানুষ বারবার প্রতারণার শিকার হন, তখন তারা অনলাইন কেনাকাটার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এতে সৎ উদ্যোক্তারা, যারা সত্যিকারের ব্যবসা করছেন, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অসচেতনতা এবং দ্রুত লাভের আশায় মানুষের তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অস্বাভাবিক কম দাম, সীমিত সময়ের অফার বা “আজই শেষ সুযোগ” এই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে প্রতারকরা মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগায়।
তবে কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। অনলাইনে কেনাকাটা করার আগে পেজ বা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা, রিভিউ দেখা, পুরনো পোস্টগুলো খেয়াল করা এবং অগ্রিম পেমেন্টের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতি ব্যবহার করাও নিরাপদ।
যদিও প্রশ্ন থেকে যায় কোন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় পত্র ব্যতিত কোন বিকাশ, নগদ কিংবা যে কোন অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট চালু করা সম্ভব নয় তাহলে কেন এই প্রতারকরা আইনের আওতায় আসেনা।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্যই এসেছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি সচেতন থাকাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনলাইন জগতের সুযোগ যেমন অসীম, তেমনি সেখানে লুকিয়ে থাকা প্রতারণার জালও অনেক সময় অদৃশ্য কিন্তু গভীর। সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই জাল থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।

















