তামাক ছেড়ে মাল্টায় বাজিমাত মামুনের, বছরে আয় ১০ লাখ
করোনার লকডাউনে যখন চারদিক স্থবির; সেই ঘরবন্দি সময়কে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কিছু করার কথা ভেবেছিলেন কলেজশিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন। সীমান্ত এলাকায় ক্ষতিকর তামাক চাষের বিপরীতে তিনি বেছে নেন মাল্টা চাষ। মাত্র আড়াই লাখ টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা সেই বাগান এখন বছরে আয় দিচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। তার এই অভাবনীয় সাফল্য শুধু নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থান করেছে কয়েকটি পরিবারের। পাশাপাশি এলাকার তরুণদের দেখাচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনার স্বপ্ন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের তালেরতল গ্রাম। এখানকার বিস্তীর্ণ জমিতে একসময় কেবল তামাকেরই রাজত্ব ছিল। তবে ২০২১ সালে সেই প্রথা ভাঙেন লালমনিরহাট সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তামাকের বদলে শুরু করেন মাল্টা চাষ। দুই একর জমিতে পরিকল্পিতভাবে বাগান তৈরি করে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এগিয়ে নেন নিজের উদ্যোগ।
উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান তার এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগের পেছনের গল্প। তিনি বলেন, ‘দুর্গাপুর ইউনিয়নটি একদম সীমান্তবর্তী। পুরো জেলায় ব্যাপকভাবে তামাকের চাষাবাদ হয়। এ কারণে মাদকের উপদ্রবও বেশি। করোনাকালীন ঘরবন্দি সময়ে চিন্তা আসে, কীভাবে মানুষকে তামাক চাষ থেকে নিরুৎসাহিত করা যায়। তরুণদের মাদকের ছোবল থেকে রক্ষায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। মূলত সেই ভাবনা থেকেই এই মাল্টা বাগানের শুরু।
বর্তমানে তার বাগানের বয়স পাঁচ বছর ছুঁয়েছে। তামাক বাদ দিয়ে গড়ে তোলা এই মিশ্র ফলদ বাগানে মাল্টার পাশাপাশি আছে কমলা ও পেঁপে। একসময় পেয়ারাও ছিল। ক্ষতিকর ফসল চাষের চেয়ে ফলের বাগান থেকে কয়েকগুণ বেশি লাভ করা সম্ভব। এখন প্রতিদিনই অনেকে বাগান দেখতে ও পরামর্শ নিতে আসেন।
যাদের জমি আছে; সেসব তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘জমিতে তামাক চাষ না করে আমরা ছোটখাটো মিশ্র ফলের বাগান করতে পারি। এতে তামাকের চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া যাবে, পরিবেশ সুন্দর থাকবে এবং কর্মসংস্থান বাড়লে হতাশাগ্রস্ত হয়ে কাউকে মাদকের দিকে ঝুঁকতে হবে না।’
আব্দুল্লাহ আল মামুনের এই উদ্যোগ শুধু তাকেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেনি, চারপাশের মানুষের মুখেও হাসি ফুটিয়েছে। বাগানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে স্থানীয় চারটি পরিবার। বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা মোকলেসুর রহমান মমিন বলেন, ‘যখন চারা রোপণ করা হয়; তখন থেকে আমরা চারজন এখানে কাজ করছি। শুরুতে ভাবছিলাম স্যার হয়তো সফল হবেন না। কিন্তু এক বছর পর যখন গাছে ফল আসতে শুরু করল, আমাদের ধারণাই বদলে গেল। এখন তো ডালে ডালে ফল। এই বাগানের বেতনের টাকায় আমাদের পরিবারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা খুব ভালোভাবে চলছে।’
মাল্টার ভারে নুয়ে পড়া ডাল আর সবুজের সমারোহ দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন তরুণ ও আগ্রহী কৃষকেরা। তারা মাল্টা চাষের পদ্ধতি, উৎপাদন খরচ ও লাভের হিসাব নিচ্ছেন। অনেকেই স্বপ্ন বুনছেন নতুন বাগান করার।
পরামর্শ নিতে আসা তরুণ শিহাব ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলে তামাকের চাষ বেশি। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে স্যার ফলের বাগান করে যে লাভবান হয়েছেন; তা দেখে আমরা শিখতে পারছি। আমি মূলত পরামর্শ নিতে এসেছি, ভবিষ্যতে আমারও এমন একটি বাগান করার ইচ্ছা আছে।’
আরেক তরুণ মজনু ইসলাম বলেন, ‘গাছে ফল আসা শুরু থেকে আমি প্রতিদিন এখানে এসে সময় দিচ্ছি। মাল্টা বাগান কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়, তার বাস্তব প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। আগামী বছর নিজের জমিতে এমন একটি ফলের বাগান করার লক্ষ্য নিয়েই প্রতিদিন এখানে আসা।’
কৃষিতে এমন উদ্যোগ তামাকনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিকল্প ফসল চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে মাল্টা চাষ ও যথাযথ পরিচর্যা করা গেলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হবেন। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।’
তামাক চাষের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে মাল্টা চাষে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাফল্য আগামী দিনের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।


আপনার মতামত লিখুন