৩০ বছর পর তিস্তার বুকে নৌকা বাইচ, ফিরে পেল হারানো ঐতিহ্য
একসময় তিস্তার বুকে ঢেউয়ের তালে তালে ছুটত সারি সারি নৌকা। মাঝিদের সম্মিলিত বৈঠার ছন্দ, দর্শকদের উল্লাস আর নদীর দুই পাড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে তৈরি হতো উৎসবের আমেজ।
কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৩০ বছর পর নীলফামারীর ডিমলায় আবারও তিস্তা নদীতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যেতে বসা এই লোকজ আয়োজন ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত নদীপারের মানুষ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা নদীতে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। স্থানীয় উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ। প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে ‘পাগলপাড়া এক্সপ্রেস’ নামের নৌকাটি বিজয়ী হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় তিস্তা নদীতে নৌকা বাইচ ছিল গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। নদীকেন্দ্রিক জনপদে এ আয়োজন ঘিরে তৈরি হতো ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের কাছে নৌকা বাইচ ছিল উপভোগের এক বিশেষ উপলক্ষ। তবে সময়ের পরিবর্তন, মানুষের ব্যস্ততা ও আয়োজনের ধারাবাহিকতা না থাকায় ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসে।
প্রতিযোগিতা দেখতে আসা স্থানীয় যুবক কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা এখনকার তরুণ, তারা এ ধরনের নৌকা বাইচ খুব একটা দেখার সুযোগ পাই না। তবে বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি, আগে ছোট-বড় বিভিন্ন নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হতো। তখন এটি ছিল মানুষের আনন্দ-উৎসবের বড় একটি অংশ।
নৌকা বাইচের অতীত স্মৃতি তুলে ধরে ষাট বছর বয়সী অলিয়ার রহমান বলেন, আমরা যখন যুবক ছিলাম, তখনকার নৌকা বাইচ আর এখনকার আয়োজনের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আগে এ খেলাকে ঘিরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতো। মানুষ অনেক আনন্দ নিয়ে নৌকা বাইচ দেখতে আসত।
স্থানীয়দের মতে, তিস্তা নদীকে ঘিরে ডিমলার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় নদীর বুকে নৌকা বাইচের আয়োজন সেই সম্পর্ককে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত। নদীর দুই পাড়ে দর্শকদের উপস্থিতি, মাঝিদের বৈঠা চালানোর প্রতিযোগিতা এবং বিজয়ী নৌকাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হতো প্রাণবন্ত পরিবেশ।
প্রায় তিন দশক পর নৌকা বাইচের আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন একটি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৌকা বাইচকে নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার এ ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে।
টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন প্রতিযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত ‘পাগলপাড়া এক্সপ্রেস’ বিজয়ী হয়।
প্রতিযোগিতা শেষে এলাকাবাসী প্রতিবছর নিয়মিত নৌকা বাইচ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।


আপনার মতামত লিখুন