অপেক্ষা ঘুচবে কার? ইংল্যান্ড নাকি নিউজিল্যান্ডের

হিসাবটা বেশ গোলমেলে। প্রথম ৯টি আসর ছিল স্বাগতিকদের দুঃস্বপ্ন। তবে সম্প্রতি ধারাটা বদলেছে। ২০১১ সালে ভারত, ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া সবশেষ দুই বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ধারাটা ২০১৯ বিশ্বকাপে অব্যাহত থাকলে শিরোপাটা এবার ইংল্যান্ডের হাতেই ওঠার কথা।
গোলমেলে কোথায়? এত একেবারে সরল হিসাব। আসলে গোলমাল বাঁধাচ্ছে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের অতীত। আইসিসির বৈশ্বিক আসরগুলো আয়োজনে ইংল্যান্ডই সবথেকে এগিয়ে। কিন্তু আয়োজক ইংল্যান্ড কোনোবারই শিরোপাটা নিজেদের কাছে রাখতে পারেনি। ১৯৭৯ সালে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরে লর্ডসে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরেছিল ইংল্যান্ড, ১৯৮৩ সালে পরের আসর আর ১৯৭৫ সালের প্রথম আসরে তো ফাইনালের আগেই দর্শক বনে গিয়েছিল তারা। এরপর ১৯৯৯ বিশ^কাপের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়।

এই শতকে দুবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আর একবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ইংল্যান্ড, প্রতিটি আসরেই ভিনদেশি দলের শিরোপা উৎসব দেখেছে ইংলিশরা। এবারও যদি সেই ধারাটা অব্যাহত থাকে? শিরোপাটা তো তাহলে নিউজিল্যান্ডেরই। তা ছাড়া আজকের ফাইনালটা যখন ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে, তখন ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড লড়াইয়ের অতীত শতভাগ নিউজিল্যান্ডের

পক্ষে। দুবারের দেখায় প্রতিবারই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে কিউইরা।
ঐতিহ্যবাহী লর্ডস ওয়ানডেতে যতবার আনন্দে মাতিয়েছে ইংল্যান্ডকে, হতাশায় পুড়িয়েছে তার থেকেও বেশিবার। ২৪টি জয়ের বিপরীতে ২৭টি পরাজয় তারই প্রমাণ। কিন্তু অতীত দিয়ে যদি এই ইংল্যান্ডকে বিচার করতে যান, তাহলে নিশ্চিতই ভুল করবেন। উইয়ন মরগানের নেতৃত্বাধীন এই ইংল্যান্ড দুর্বার, দুর্বিনীত। লিগপর্বে নিউজিল্যান্ডও তো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে তা। চেস্টার-লি-স্ট্রিটের রিভারসাইড গ্রাউন্ডে ১১৯ রানের বড় ব্যবধানে হার দেখতে হয়েছিল কেন উইলিয়ামসনের দলকে।
বেশিরভাগের দৃষ্টিতেই আজকের ফাইনালে ইংল্যান্ড পরিষ্কার ফেবারিট। কিন্তু চোখের দেখাই তো আর সব নয়। আসলে ম্যাচটা যখন বিশ্বকাপের ফাইনাল, সেখানে ফেবারিট তত্ত¡ নিতান্তই অর্থহীন। আর ফেবারিটরাই যদি সবসময় জয় পেত, তাহলে তো নিউজিল্যান্ডের ফাইনালে ওঠারই কথা নয়। এই বিশ^কাপ শুরুর আগে থেকেই ইংল্যান্ড আর ভারতকে শিরোপার প্রধানতম দাবিদার মানা হয়েছে। সেমিফাইনালে এক দাবিদার ভারতকে হারিয়েছে নিউজিল্যান্ড, তাহলে ফাইনালে আরেক দাবিদার ইংল্যান্ড নয় কেন?
এই মন্ত্রে নিজেদের উদ্দীপ্ত করেই পয়মন্ত লর্ডসে পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। দলটির কোচ গ্যরি স্টিড তো বলেই দিয়েছেন, শিরোপা জিতেই ঘরে ফিরতে চায় তার শিষ্যরা। গত আসরের ফাইনালে তাসমান প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারের ক্ষতটা এবার ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সারিয়ে তুলতে চায় কিউইরা। সেই চাওয়া পূরণে আজ নিজেদের সেরা ক্রিকেটটাই খেলতে হবে, সেটাও শিষ্যদের মনে করিয়ে দিয়েছেন স্টিড।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বার ফাইনাল খেলতে নেমেই আজন্মের অপেক্ষা ঘোচাতে চায় নিউজিল্যান্ড। অভিন্ন চাওয়া চতুর্থ ফাইনাল খেলতে যাওয়া ইংল্যান্ডেরও। ২৭ বছর আগে এই নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েই শেষবার ফাইনাল খেলেছিল ক্রিকেটের জনক দেশটি। তবে ইমরান খানের পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে সেবার কাপ জেতা হয়নি তাদের। কিন্তু এবার ঘরের মাঠে প্রবল সমর্থন আর ক্রিকেট-উন্মাদনার আবহে বিজয়ী হওয়ার সেরা সুযোগ দেখছে ইংল্যান্ড।
জেসন রয়, জনি বেয়ারস্টো, জো রুট, মরগান, বেন স্টোকসরা ব্যাট হাতে স্বপ্নীল সময় কাটাচ্ছেন। তাদের বিপক্ষে আজ কঠিন পরীক্ষাই দিতে হবে ট্রেন্ট বোল্ট, লুকি ফার্গুসন, ম্যাট হেনরিদের। নিউজিল্যান্ডের এই পেস ত্রয়ীর সময়টাও দুর্দান্ত কাটছে। ২৩৯ রানের সাদামাটা পুঁজি নিয়েও ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে কিউইরা তো জিতল তাদেরই স্মরণীয় পারফরম্যান্সে। তাই ছন্দে থাকলেও কিউই বোলারদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের।
ইংলিশ বোলারদেরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে কিউই অধিনায়ক উইলিয়ামসনকে নিয়ে। গোটা বিশ্বকাপে দলের ব্যাটিং বিভাগকে বলতে গেলে একাই টেনেছেন তিনি। সময়ের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যানকে দ্রুত ফেরানো গেলে অর্ধেক কাজ সারা হয়ে যাবে ইংলিশ বোলারদের। আসর জুড়ে নিজেকে হারিয়ে খোঁজা মার্টিন গাপটিল, হেনরি নিকোলস, টম লাথামদের ব্যর্থতার বৃত্তে আটকে রাখার সামর্থ্য আছে জফরা আর্চার, ক্রিস ওকস, মার্ক উডদের। লেগস্পিনার আদিল রশিদও মুখিয়ে আছেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে করা পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে।
পূর্বাভাস বলছে, আজকের আবহাওয়া থাকবে শুকনো। ভাসমান মেঘ দেখা যাবে আকাশে। ফলে কখনও মেঘ, কখনও রোদের দেখা মিলবে। তবে বৃষ্টির শঙ্কা নেই। ফলে কালো মেঘের থেকে দূরে থাকা লর্ডসের উইকেট থাকবে শুকনো। অবশ্যই তা হবে ব্যাটিংবান্ধব। তবে স্পিনাররা সেখানে হয়ে উঠতে পারেন তুরুপের তাস। কারণ দুই দলের ব্যাটসম্যানরাই স্পিনের বিপক্ষে অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তাই পেসার লিয়াম প্লাঙ্কেটের জায়গায় ইংল্যান্ড আজ অফস্পিন অলরাউন্ডার মঈন আলীকে নিয়ে মাঠে নামলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না আজন্মের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ইংল্যান্ড শিরোপাটা জিতে নিলেও। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে যেই জিতুক, একটা বিষয় কিন্তু নিশ্চিত ২৩ বছর পর নতুন চ্যাম্পিয়ন পেতে যাচ্ছে ক্রিকেট বিশ্ব। ক্রিকেট তীর্থ লর্ডস আজ হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন ইতিহাসের সাক্ষী। ইংল্যান্ড কিংবা নিউজিল্যান্ডের প্রথম বিশ্বজয়ের সাক্ষী।