বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ

প্রবাসী ডেক্সঃ অশ্রুসিক্ত রক্তাক্ত অধ্যায়ের অন্য নাম ১৫ই আগস্ট। আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় রাত এটি। যে রাতে স্ত্রী-সন্তানসহ সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন আরেকজন মহান নেতার আর্বিভাব ঘটেনি। শোকে স্তব্দ হয়ে গেছিল সেদিনের সেই ভয়াল রাতে। পিতা হারানোর শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি এ জাতি। কী নিষ্ঠুর, কী ভয়াল, কী ভয়ঙ্কর সেই রাত। মুজিবকে হারিয়ে সেদিন হেরেছিল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বাপর দুটি ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ চোখে দেখার সুযোগ নেই। একটি হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যটি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা। তাই মুক্তিযুদ্ধকে অবহেলার চোখে দেখা ও বিবেচনা করা যেমনটি অন্যায় ঠিক তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টকেও অবজ্ঞার চোখে দেখা অন্যায়। বাঙালি কতটা লোভী ও ক্ষমতান্ধ হলে এমন নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটাতে পারে তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। বছর ঘুরে রক্তের কালিতে লেখা সে দিন-রাত আবার ফিরে এসেছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইতিহাসের এই নৃশংসতম হত্যাকা-টি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনে যখন সরকার ব্যস্ত, তখনই হত্যা করা হলো দেশের স্থপতিকে। এ হত্যাকা-ের নেপথ্যে ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করার, ভিন্ন পথে ধাবিত করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি যেমন ছিল, তেমনি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিতে লুকিয়ে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী ও নিচু মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকেই সুযোগ খুঁজতে থাকে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, নানা ছত্রচ্ছায়ায় তারা সংগঠিত হতে শুরু করে। আর তাদের সঙ্গে হাত মেলায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কিছু আন্তর্জাতিক শক্তি। আর তারই শিকার হন শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারকে হত্যার প্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকেই হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদর্শের মৃত্যু নেই- এই সত্যটি তারা উপলব্ধি করতে পারেনি।
বস্তুত পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট বাংলাদেশ নামক কল্যাণরাষ্ট্রটির হত্যারই একটি অপচেষ্টা, ঘাতকের এটা জানা ছিল যে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে সামরিক সন্ত্রাস, উগ্র-মৌলবাদ আর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যের বাংলাদেশ তৈরি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দশকের পর দশক ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। আর আকাশে ধ্বনিত হয়েছে খুনিদের উল্লাস ও আস্ফালন। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত রাষ্ট্র বাংলাদেশেরও মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর চেষ্টা হয় ওই দিন। বাংলাদেশের ভিত্তি যে শাসনতন্ত্র তা ভূলুণ্ঠিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় তখনই। তাই একুশ বছর হীন চক্রান্ত করে ঠেকিয়ে রাখা হয় আওয়ামী লীগকে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকেও তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত করেছিল। একাত্তরের ঘাতকদেরকে বসানো হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাই এই অমানবিক হত্যাকা-কে বাংলাদেশের হত্যাকা-ই বলা চলে। বাংলাদেশের মূলনীতিগুলোকে হত্যা করার অপচেষ্টা। পঁচাত্তরের ঘাতকদের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বাঙালি ও বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করা।
একথা অনস্বীকার্য যে, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনাবলির ভিতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। সে সময়ই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিকল্প নেতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নয় মাস কারান্তরালে থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধাদের বুক জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল উপস্থিতি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাঙালির দীর্ঘদিনের আত্মানুসন্ধান, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আসলে জাতির মুক্তিসংগ্রামে নেতা একজনই। দীর্ঘ আপসহীন রাজনৈতিক কর্মকা-, নিরঙ্কুশ জনসমর্থন এবং সর্বোপরি জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেতিনি পরিণত হয়েছিলেন এ জাতির অবিসংবাদিত নেতায়।
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনগণের প্রতি ভালোবাসা আর একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। যতদিন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পৃথিবীর বুকে পরিচিত থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর বুকে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিংশ শতাব্দীর বাঙালির নবজাগরণের প্রতিভূ বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রধান পুরুষ তিনি। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচনে তার অবদান বিশ্বস্বীকৃত। কিন্তু এমন মানুষটিও স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের কবল থেকে বাঁচতে পারেননি। তবে হত্যাকা- ঘটিয়ে শারীরিক বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্বের ক্রিয়াশীলতা সাময়িকভাবে থমকে দেয়া সম্ভব হলেও, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনা’ শাশ্বত কারণে খুনিচক্র তা চিরতরে স্তব্ধ করতে পারেনি। কারণ তিনি জনগণের নেতা ছিলেন, জনসমর্থনই ছিল তাঁর মূল প্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর মতো এমন তেজস্বী, দূরদর্শী ও সৎ সাহসী রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব এই বাংলায় আর কখনও ঘটেনি। ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২’র ভাষা আন্দোলনে একজন সংগ্রামী নেতা। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন তিনি। ষাটের দশক থেকেই তিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্খা ও নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেন।