জলঢাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে “জীবনতরী পাঠশালা”

নীলফামারীতে জীবনতরীর মাধ্যমে শিক্ষায় আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন ‘জীবনতরী পাঠশালা’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজিক সংগঠন। নীলফামারী জেলা শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে জলঢাকা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড দুন্দিবাড়ি (মাইজালীপাড়) গ্রামে পাঠশালাটি যাত্রা শুরু করে ২০১৮ সালে । আলোকিত সমাজ গড়ার অঙ্গিকার নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পরা রোধ করতে, বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করন, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে বিদ্যালয় মুখীকরন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চত করনে বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদেরকে সচেতন করে আলোকিত সমাজ গড়ার জন্য জীবনতরী পাঠশালার মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সংগঠনের সদস্যরা। জীবনতরী পাঠশালায় পাঠদান করাচ্ছেন উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের ৭ জন শিক্ষার্থী। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ৫২ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো হয়। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় আট শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের সেবাসমুহ পাচ্ছে। পাঠ্যদানে নিয়োজিত আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজ, জলঢাকা এর দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত জীবনতরী পাঠশালার শিক্ষক সবুজ ইসলাম বলেন আমাদের এখানে বিকাল ৩টা থেকে ৫.৩০ মিনিট পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। এখানে যেসব শিক্ষার্থী পড়তে আসে তারা সবাই দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়ে। টাকা দিয়ে ভালো প্রাইভেট পড়াতে পারে না। এজন্য আমাদের এখানে বিনামূল পড়তে আসে। আমরা তাদের বিদ্যালয়ের পড়াগুলো প্রস্তুত করে দওয়া দেই। এতে তারা অনেক উপকৃত হয়। নীলফামারী সরকারি কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল-আমিন ইসলাম বলেন,এখানে যারা আসে সবাই দরিদ্র হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। কারো নেই বাবা কারো নেই মা। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তাদের খাতা, কলম পুরস্কার দেই, আমরা যে শুধু পাঠদান করাচ্ছি তা কিন্ত নয়। এর ফলে আমরাও উপকৃত হচ্ছি। শেখার শেষ নেই। আমরা শিখতেছি। আমাদেরও চর্চা হচ্ছে। ভবিষ্যতে চাকরির জন্য আমরা প্রস্ততি নিচ্ছি এখান থেকে।’ জীবনতরী পাঠশালায় শিক্ষা নিতে আসা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আলিফ জানায়, তারা বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এসে বিশ্রাম নিয়ে বিকাল বেলা এখানে পড়তে আসে। বিদ্যালয়ের পড়া গুলো প্রস্তুত করে নেয়, পড়া শেষ করে বাড়িতে ফিরে যায়। এখানে এসে পড়াশোনার প্রতি আরো আগ্রহ বেড়েছে তাদের। প্রতিযোগিতায় অংশও নেয় নিয়মিত। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী আজিমা আক্তার বলেন আগে আমি ভালো করে লিখতে ও পড়তে পাড়তাম না। এখানে স্যার আমাদের লিখা ও পড়া ভালো করে শিখিয়ে দেয়। এখন আমি অনেক ভালো পড়তে পারি। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রহমত আলী মা বলেন,আমি গরীব টাকা দিয়ে ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতে পারি না। আমার ছেলে ভালো ভাবে পড়তে পারতো না, আমি নিজেও পড়াতে পারতাম না। অপিজার রহমান এর সাথে যোগাযোগ করে এই ‘জীবনতরী পাঠশালা’য় পড়তে পাঠাই। এখানে এসে অনেক ভালো পড়তে পারে,লিখতে পাড়ে। এখন লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী হয়েছে। সংগঠনটির প্রধান উদ্দ্যোগতা প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, গংগাচরা সরকারি কলেজের ছাত্র মোঃ অপিজার রহমান স্নাতক চতুর্থ বর্ষে অধ্যায়নকালে সামাজিক দায়বোধ থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু কাজ করার আইডিয়া করে। সেই আইডিয়া এলাকার তরুণদের কাছে শেয়ার করলে তার সাথে যুক্ত হয় অসংখ্য তরুণ তাদের মধ্যে আমিনুর রহমান, সবুজ ইসলাম, আল-আমিন ইসলাম স্বপন, সেলিম ইসলাম, জিকরুল ইসলাম, রিপন ইসলাম, মিলন হক, সুমন ইসলাম আরিফুজ্জামান বাবু, মাসুম, আব্দুল হান্নান,হাসিবুল ইসলাম সহ মোট ২১ জন। তাদেরকে সাথে নিয়ে ২০১৮ সালে ‘জীবনতরী পাঠশালা’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজিক সংগঠন গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপিজার রহমান বলেন, ‘আমরা ছয় ভাই-এক বোন। অর্থাভাবে সবাই পড়াশোনা করতে পারেনি। ২০১৪ সালে যখন আমি এইচএসসি পাস করি তখনেই এ রকম একটি সংগঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। সে সময়ে কারো সাড়া না পেয়ে পরে অন্য বেশ কিছু সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ২০১৮ সালে এলাকার তরুণদের কাছে সামাজিক দায়বোধ আলোচনা করে আলোকিত সমাজ গড়ার একটি আইডিয়া শেয়ার করি, সেই আইডিয়ার সাথে একমত হওয়া সবাইকে নিয়ে ‘জীবনতরী পাঠশালা’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজিক সংগঠন গঠন করি। এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ানো ও প্রতি মাসে তাদের শিক্ষা উপকরণ দিচ্ছি। যাতে করে অর্থের অভাবে কারো লেখাপড়া বন্ধ হয়ে না যায়। আমরা সেই চেষ্টাই করতেছি সামাজিক দায়বোধ থেকে। সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আতাউল গনি ওসমানী বলেন যে ‘জীবনতরী পাঠশালা’ সংগঠনের মাধ্যমে কয়েক জন শিক্ষার্থী বিনামূল্যে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য যে পাঠদান করে যাচ্ছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। জীবনতরীর মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশে শিক্ষার আলো পৌঁছে যাবে আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে। এটি একটি অনুকরণীয় কেন্দ্র হতে পারে। এজন্য সবার সহযোগিতার হাত বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে আমি করি।