হলদিবাড়ি-চিলাহাটী রেলযোগাযোগ-বাংলাদেশ অংশে রেলপথ নির্মানের কাজ শুরু।

প্রায় ৫ দশক ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়া নীলফামারীর চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথে ভারতের সঙ্গে সরাসরি রেলযোগাযোগ পুনরায় স্থাপন হতে যাচ্ছে।
দির্ঘ প্রতিক্ষার পর বাংলাদেশের চিলাহাটী থেকে ভারতের হলদিবাড়ি পর্যন্ত রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর লক্ষে নতুন রেললাইন পাতার কাজ শুরু করেছে রেল মন্ত্রনালয়।

আজ বৃহস্পতিবার (৫সেপ্টেম্বর) চিলাহাটি রেলঘুন্টির পাশে ৩টি সংযোগ রেলের জন্য মাটি লেবেল করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন রেললাইন পাতার কাজ শুরু হলো। ইতিমধ্যে পরিত্যাক্ত রেললাইনের উপর যেসব স্থাপনা ছিল তা সরানো হয়েছে। উভয় দেশের ১১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে বাংলাদেশ অংশের প্রায় সাড়ে– সাত কিলোমিটার রেললাইন নির্মানের কাজ করছে ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। রেলপথটি নির্মাণের কাজ ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানা গেছে।

ভারতের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এবং চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায়। এই বরাদ্দকৃত অর্থে সাড়ে ৭ কিলোমিটার রেলপথ, ব্রীজ, চিলাহাটি রেলষ্টেশনকে আন্তর্জাতিক মানের রেল স্টেশনে রূপান্তর করা হবে।

অপরদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দকৃত ৩১ কোটি রুপি দিয়ে ভারতের হলদীবাড়ি অংশে ৪ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপনের কাজ ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর শুরু করা হয়। যা ২০১৮ সালের ১৪মার্চ সমাপ্ত করে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটী ডাঙ্গাপাড়া সীমান্ত বিপি ৭৮২/২ এস নম্বর পিলারের নিকটবর্তী কাটাতারের বেড়া পর্যন্ত। পরীক্ষামূলক ভাবে রেলের ইঞ্জিন চালানো হয়। সেদিন ইঞ্জিন যাত্রার সূচনা করেছিলেন,ভারতের এনজেপির ডেপুটি চিপ ইঞ্জিনিয়ার (নির্মান) রামকুমার বাদল। এখন চলছে ভারতের হলদীবাড়ি রেলস্টেশনটিকে আন্তর্জাতিক মানের নির্মান কাজ।

চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেললিংকের কাজ শুরু হওয়ায় আনন্দ খুশীতে এখন আত্নহারা উত্তরের জেলা নীলফামারীর মানুষজন। চিলাহাটি বনিক সমিতির সাধারন সম্পাদক রুবাইয়াত হোসেন ডন বলেন, এই রুটে মালবাহী ট্রেন চালু হলে উপকৃত হবে ব্যাবসায়ীরা। এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যাবে। ডোমার উপজেলার রেল যোগাযোগ রক্ষা কমিটির আহবায় গোলাম কুদ্দুস আইয়ুব বলেন, এই রুটে ট্রেন চালু হলে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলার বন্ধন ঘটবে এবং এলাকার মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে।
১৪৯ বছর আগের কথা, আজকের বাংলদেশের উত্তরের নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আহরণের জন্য নির্মাণ করতে থাকে রেলপথ। আর সেই রেলপথগুলো পুরো ভারত উপমহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধেছিল। সেই সময়ে ১৮৭০ সালে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজো বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। আসাম-বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১১০ একর জায়গার ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত ভাগের পরও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি মধ্যে এই ইন্টারচেঞ্জ চালু ছিল। সে সময় চিলাহাটি ও হলদিবাড়ি স্টেশনের উজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করে এখনও গর্ববোধ করেন এলাকার বাসিন্দারা। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত হলদিবাড়ির সঙ্গে তদানীন্তর পাকিস্তানের রেল যোগাযোগ ছিল। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতার আগে হলদিবাড়ি-চিলাহাটি দিয়ে সরাসরি কলকাতার যোগাযোগ ছিল। দার্জিলিং মেল ট্রেনটি তখন এই পথে দর্শনা হয়ে যাতায়াত করতো। সেই সময় চিলাহাটি হলদিবাড়ির গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল।
দেশ ভাগের পরেও চিলাহাটি থেকে একটিমাত্র ট্রেন হলদিবাড়ি চিলাহাটি চলাচল করতো। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এটি আর চালু হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে রেল রুটটি চালুর উদ্দ্যোগ নেয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এই পরিত্যক্ত রেলপথটি পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৮ মে থেকে সপ্তাহ ব্যাপী বাংলাদেশের অংশের এবং ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে ভারতের অংশের জরিপ কাজ শেষ করা হয়। দীর্ঘ ৫ দশক পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ির পরিত্যক্ত রেলপথ কে পুনরায় চালু করতে যাচ্ছেন। যা বদলে দিবে চিলাহাটি-হলদিবাড়ির চেহারা।

রেলওয়ে সুত্র মতে বর্তমানে খুলনার মংলা, ঢাকা ও রাজশাহী থেকে সরাসরি ব্রডগেজের রেলপথ চালু রয়েছে নীলফামারী চিলাহাটি সীমান্তের স্টেশন পর্যন্ত। কাজ সম্পন্ন হলে ভারতের হলদীবাড়ি হয়ে জলপাইগুড়ি নিউ জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি সাথে ফের সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এখন ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল করে কলকাতা-গেদে-দর্শনা-হার্ডিন ব্রিজ হয়ে ঢাকা চলাচল করবে।
হলদিবাড়ি-চিলাহাটি রেল পথ চালু হলে হার্ডিন ব্রিজ হয়ে ফের অতীতের পথে শিলিগুড়ি-কলকাতা রেল চলাচল শুরু হবে। সেই সাথে ঢাকা নিউজপাইগুড়ি(শিলিগুড়ি) ট্রেন চলাচল করবে সরাসরি।
সুত্র মতে রেলপথ স্থাপন শেষ হলে প্রথম ধাপে চলাচল করবে পন্যবাহী রেল। দ্বিতীয় ধাপে যাত্রীবাহী ট্রেন। যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে ঢাকা হতে নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) ও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত হয়ে কলকাতা শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন চালানো হবে বলে রেল সুত্রে জানা যায়।।