ভক্তদের কাঁদিয়ে আকাশে উড়াল দেয়া সেই কিংবদন্তির আজ জন্মদিন

গতবছরের এই দিনে শেষ জন্মদিন উদযাপন করেন কিংবদন্তি ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু। এদিন তিনি বলেছিলেন, ‘এমন কিছু গান করতে চাই, যা আগে কখনো করিনি। এই গানগুলো নিজে লিখব, সুর করব ও গাইব।’

তবে তা আর হয়ে উঠল না। ঠিক দুই মাস পর আইয়ুব বাচ্চু পৃথিবী ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন হঠাৎ করেই।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে জন্ম হয় আইয়ুব বাচ্চুর। মা-বাবার আদরের ছেলে ছিলেন তিনি। আর সব কিশোরের মতো গতানুগতিক নিয়মে জীবনটা চালিয়ে নেয়ার ছিলেন না তিনি।

কিছু একটা করে দেখানোর অদম্য স্পৃহা কাজ করত তার সবসময়ই। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই বাউন্ডুলে স্বভাবের ছিলেন কিছুটা। বাবার ব্যবসায় মন বসেনি তার। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি।

আর সেই ছেলেটির গানই এখন সবার মুখে মুখে। ১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এলিফ্যান্ট রোডের এক হোটেলে উঠেছিলেন। ঢাকায় ঠাঁই নেয়ার মতো ভালো কোনো জায়গা ছিল না তার। অথচ সেই ছেলেই এখন শত কোটি ভক্তদের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন।

মূলত রক ঘরানার গান করতেন আইয়ুব বাচ্চু। শুরুর দিকে ইংরেজি গান, হার্ড রক, ব্লুজ, অলটারনেটিভ শোনাতেন শ্রোতাদের।

বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকারে জিমি হেন্ডরিক্স, জো স্যাটরিনি, স্টিভ মুররে নিজের অনুপ্রেরণা বলে জানিয়েছিলেন।

কিন্তু শুধু রক বা ব্যান্ডের গানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না বাচ্চু। আধুনিক গান, লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। লোকগান নিয়ে করা তার একটি রিমেক অ্যালবাম শ্রোতাপ্রিয়তা পায়।

বাংলা চলচ্চিত্রে খুব অল্প কয়েকটি গান গেয়েছেন বাচ্চু। সবকটি গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তার আম্মাজান গানটি ঢাকাই ছবিতে কালজয়ী গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এলআরবি ব্যান্ড গড়ার আগে অনেকগুলো ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সবকটি ব্যান্ড থেকে বারবারই বেরিয়ে আসতে হয়েছিল তাকে। সবশেষে এলআরবির আগে তিনি ছিলেন সোলস ব্যান্ডে। অভিমান নিয়ে এই ব্যান্ড থেকেও বেরিয়ে এসেছিলেন।

একবার হোটেল ব্লু নাইলে সোলসের সভা চলছিল। মন খারাপ করে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যান বাচ্চু। গীতিকার শহীদ মাহমুদের সঙ্গে সিঁড়িতে দেখা হলে ছলছল চোখে বাচ্চু বলেছিলেন, ভাই, সোলস ছেড়ে দিলাম। সোলস থেকে ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ গানটি চেয়ে নিয়েছি।

সোলস ছেড়ে ১৯৯০ সালের ৫ এপ্রিল নিজের ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ ব্যান্ড দল প্রতিষ্ঠা করলেন আইয়ুব বাচ্চু। পরে এর নাম বদলে রাখেন ‘লাভ রান্‌স ব্লাইন্ড’। অর্থাৎ এলআরবি নামটি ঠিকই রাখলেন।

সেই বছরই এলআরবি একটি ডাবল অ্যালবাম দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করে। বাংলা ব্যান্ড জগতের ইতিহাসে সেটাই প্রথম ডাবল অ্যালবাম। এই অ্যালবাম দুটির বেশ কিছু গান খুব জনপ্রিয় হয়, যা এখনও শোনেন শ্রোতারা।

ব্যান্ড জগতের সেরা ভোকালিস্ট হলেও সব ছাপিয়ে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন গিটারের জাদুকর। তিনি সব সময় বলতেন, গিটার আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। গিটারের জন্যই ঘর ছেড়েছি।

অথচ জীবনের শেষ দিকে এসে আক্ষেপে-অভিমানে গিটারগুলো বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল, আমার গিটারগুলো নিয়ে গিটার বাজিয়েদের সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী একটি গিটার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান করার, যেখানে এই গিটারগুলো বাজিয়ে বিজয়ীরা জিতে নেবে আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় একেকটি গিটার! কিন্তু বেশ কিছুদিন চেষ্টা করার পরও কোনো পৃষ্ঠপোষকই পেলাম না…।’

আজ আইয়ুব বাচ্চুকে ছাড়াই তার জন্মদিন পালন করবে এলআরবি ব্যান্ডের সদস্যরা। গানের ভাষায় আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে। অথচ তিনি নিজেই অগণিত শ্রোতাদের কাঁদিয়ে গতবছরের ১৮ অক্টোবর আকাশে উড়াল দিলেন।