ভ্যাটের চাপ পড়েছে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্তের ওপর বাজেটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে বেড়েছে বাড়ি ভাড়া, কথা বলার ও পোশাকের খরচ এরা সঞ্চয় ভেঙে খাবেন অথবা তাদের জীবনযাত্রার মান কমবে

বাজেট পরবর্তী অবস্থা || মধ্যবিত্ত যাবে কোথায়?

একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন আবদুর রহিম। মাসে সর্বসাকুল্যে বেতন পান ৩০ হাজার টাকা। দুই সন্তান নিয়ে থাকেন রাজধানীর গোলাপবাগের একটি ভাড়া বাড়িতে। মাসে ১৩ হাজার টাকা বাসা ভাড়া গুনতে হয় তাকে। দুই সন্তানের স্কুলের খরচ লাগে অন্তত ৮ হাজার টাকা। এছাড়া নিজের ও সন্তানদের যাতায়াতের খরচ হয় আরও অন্তত ৪ হাজার টাকা। বাকি ৯ হাজার টাকায় পুরো মাসের খরচ চালাতে হয়। জরুরি কোনো প্রয়োজন হলে ধার কর্জ করতে হয়। এ অবস্থায় বছর শেষেই বাড়ি ভাড়া অন্তত ৫০০ টাকা বাড়ে। সন্তানদের স্কুলে প্রতিবছরই বেতন বাড়ায়। বাজেটের পর রহিমের পরিবারের বাজেটে যোগ হয়েছে নতুন খরচ। বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে জ্বালানি গ্যাসের বর্ধিত মূল্য। এ অবস্থায় ঠিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে তার। রহিমের মতো চতুর্মুখী ব্যয় বৃদ্ধির চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

এবারের বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে যেসব উদ্যোগ মধ্যবিত্তকে চাপে ফেলেছে সেগুলোর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানো, টেলিফোনে কথা বলার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো, পোশাকে ভ্যাট বাড়ানো, বাড়ি ভাড়া, সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর বাড়ানো এবং খাদ্যপণ্যে ট্যারিফ মূল্য বিলুপ্ত করা।

এছাড়া পুরো বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর বেশি জোর দেয়া হয়েছে, যা ভোক্তা শ্রেণির ব্যয় বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের অযৌক্তিভাবে গুরুত্ব কম দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রধানত মধ্যবিত্তরা হয়তো সঞ্চয় ভেঙে খাবেন অথবা তাদের জীবনযাত্রার মান কমবে।

প্রতি বছর বাজেটের পর জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর যে প্রভাব পড়ে তার প্রধানতম শিকার মধ্যবিত্ত সমাজ। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে, তারাই মধ্যবিত্ত। তবে আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধাকেও মানদন্ডে আনতে হবে। ওই বিবেচনায় বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৪ কোটির মতো।

জানতে চাইলে অধ্যাপক আবুল বারাকাত বলেন, নিত্যপণ্যের দাম, বাড়ি ভাড়া, ডাক্তারের ফি, হাসপাতাল খরচ, সাংসারিক খরচ, অনুষ্ঠানে কমিউনিটি সেন্টার ও হোটেল ভাড়া- এসবের খরচ মধ্যবিত্তের জীবনে প্রভাব ফেলে। বাজেটে মধ্যবিত্তকে চাপে রেখে ধনীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে দ্রম্নত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হচ্ছে। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিশাল অংশ চাকরি করেন। তারা এখন ফ্ল্যাট বা জমির মালিক। তারা ইন্টারনেটও ব্যবহার করেন। টাকা-পয়সা রাখে ব্যাংক হিসাবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন মধ্যবিত্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্ত হবে।

বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে- বাংলাদেশে যত মধ্যবিত্ত রয়েছে, এর ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেকই বেসরকারি চাকরি করে। আর ২০ শতাংশের বেশি সরকারি চাকরি করে। মধ্যবিত্তদের মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবসা করে। নিম্ন মধ্যবিত্তের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বেসরকারি চাকরি করে। আর ব্যবসায় সম্পৃক্ত মাত্র ১৭ শতাংশ। এক সময় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা শুধু উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যবিত্তের বিকাশে জরুরি প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহে সরকারের মনোযোগ কম। মধ্যবিত্তের বিকাশে যে বিষয়গুলোতে জোর দেয়া প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতিচর্চা। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান শক্তি শিক্ষা-সংস্কৃতি-ধর্মীয় মূল্যবোধ। মধ্যবিত্ত সমাজের প্রত্যাশা সীমিত জীবনযাত্রার ব্যয়, সন্তানের জন্য শিক্ষার সুব্যবস্থা এবং শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- দেশে ভোগবাদি আর নিম্নবিত্তের অবারিত সুযোগ-সুবিধায় অনেকটা কোণঠাসা হয়ে না ঘরকা, না ঘাটকা অবস্থায় ঝিম মেরে আছে মধ্যবিত্ত সমাজ। সমাজে উচ্চবিত্তদের অভাব নেই। বরং তারা বিত্তের প্রভাবে বাজার মূল্যকেও প্রভাবিত করে। যার জের টানতে হয় মধ্যবিত্তকে। এ ছাড়া জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমূল্যের সঙ্গে তারা পেরে উঠছেন না। সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। আবার শিক্ষা শেষে ঘুষ ছাড়া চাকরিও মিলছে না। চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় কোথায় যাবে মধ্যবিত্তরা।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাত বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট ও মধ্যম আয়ের নাগরিকদের বিদু্যতের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে বেশ ভালো বেগ পেতে হচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী ছাড়া অন্যান্য এসব জিনিসের মূল্যস্ফীতির অঙ্কটা হয়ে গেছে দ্বিগুণ যা অদূর ভবিষ্যতে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

আবার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন ‘বাজেটে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের আশার প্রতিফলন ঘটেনি। ভ্যাটের চাপ পড়বে এসব শ্রেণির ওপর।

অন্যদিকে, দুঃসময়ের জন্য ভরসা হিসেবে মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তারা সঞ্চয় করেন। এবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের ভরসা যে সঞ্চয়পত্র, সেই সঞ্চয়পত্রের ওপর কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা খাত। এটি সাধারণ আয়ের অবসরপ্রাপ্ত মানুষের শেষ অবলম্বন। এছাড়া মধ্যবিত্তের মধ্যে যারা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, তারাও এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশে বিনিয়োগ বা প্রণোদনা নেই। তাদের সীমিত সঞ্চয় বিকাশে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। উপরন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানসিকভাবেও তাদের পদে পদে ধাক্কা খেতে হয়। অথচ দেশে মধ্যবিত্তরাই এখন উন্নয়নের বড় অংশীদার। কারণ তারাই পণ্য বাজারজাতের বড় ভোগীদার। মধ্যবিত্তের প্রসারণের ফলেই নগরায়ণ বাড়ছে, বাড়ছে মাধুর্যতা।

মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ প্রসঙ্গে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভালস্নার মত দিয়েছেন, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি যত বড় হবে ততই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে থাকবে।’ জাতীয় প্রবৃদ্ধি যতই বাড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল ইস্টার্লি মনে করেন, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণির মতের মিল থাকলে দেশের উপার্জনের মাত্রা ও প্রবৃদ্ধি বেশি হয়। সমানতালে গণতন্ত্র প্রসার লাভ করে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা হ্রাস পায়। হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানব পুঁজি সৃষ্টি হয়। অবকাঠামোর সমাহার হতে থাকে। অর্থনৈতিক নীতি উত্তম হয়। আধুনিক কাঠামো তৈরি ও নগরায়ণ প্রসার লাভ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এবারের বাজেট সাধারণ মানুষের পক্ষে যায়নি। বড় ধনী শ্রেণির পক্ষে গেছে। তার মতে, সাধারণ মানুষের আয়ের একমাত্র উৎস সঞ্চয়পত্রে কর বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে, শেয়ারবাজারের বড় ব্যবসায়ীদের কর হার কমিয়ে সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা চরম বৈষম্য বলে মনে করেন তিনি।

বাজেটের প্রভাব বাজারে

রাজধানীর বাজারে বাজেটের প্রভাবে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তি। বাজেটে কর আরোপের কারণে বেড়েছে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম। এ ছাড়া ডিম, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, সবজি ও আলুর দামও বেড়েছে।

এদিকে বিশ্ববাজারে চিনির দাম এখন বেশ কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত মাসে চিনি বিক্রি হয়েছে টনপ্রতি ২৮০ মার্কিন ডলার দরে। বাংলাদেশে দাম বেড়েছে বাজেটে কর আরোপের কারণে। এবার বাজেটে চিনির ওপর নতুন করে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাড়ানো হয়। তাতে প্রতি কেজি চিনিতে কর বাড়ে প্রায় ৫ টাকা।

কারওয়ান বাজারে যেসব খুচরা দোকানে আগে চিনি ৫২ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে গতকালের দর ৫৬ টাকা। একই বাজারের পাইকারি প্রতিষ্ঠান সোনালি ট্রেডার্সের মালিক আবুল কাশেম বলেন, বাজেটের আগে প্রতি বস্তা চিনির দাম ২ হাজার ৪০০ টাকার মতো ছিল, এখন সেটা ২০০ টাকা বাড়তি। একইভাবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ড্রামপ্রতি (২০৪ লিটার) ৪০০ টাকা বেড়ে ১৪ হাজার ২০০ টাকা ও পাম তেলের দাম ড্রামে ৬০০ টাকা বেড়ে ১০ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে বলে জানান তিনি। আবুল কাশেমের হিসাবে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২ টাকা ও পাম তেলের দাম প্রায় ৩ টাকা বেড়েছে।

এছাড়া ডিমের দামও বেশ চড়া। প্রতি ডজন ফার্মের ডিম ১১০-১১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা কয়েক দিন আগে ১০০-১০৫ টাকায় নেমেছিল। হাঁসের ডিমের ডজন এখন ১৩০ টাকা, যা আগের চেয়ে ১১০ টাকা বেশি। ভালো মানের দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৪৫-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকা কেজি দরে।